এক হাজার একশো বিয়াল্লিশটা খুন শুধু জানুয়ারি থেকে এপ্রিল, খালি চার মাস। মানে প্রতিদিন গড়ে তিনটা লাশ, তিনটা পরিবার। এর সাথে যোগ করুন নারী-শিশু নির্যাতনের পাঁচ হাজার নয়শো আটানব্বইটা মামলা। মানে প্রতিদিন পঞ্চাশটার বেশি। প্রতি আধঘণ্টায় একটা, দিনে রাতে মিলিয়ে। ঘুমের মধ্যে, রান্নাঘরে, রাস্তায়। এই হলো বাংলাদেশ, ফেব্রুয়ারি ২০২৬-এর পর।
দুর্নীতির দায়ে বছরের পর বছর লন্ডনে পালিয়ে থাকার পর তারেক রহমান বাংলাদেশে এসে ডায়ালগবাজি করেছিলেন, আই হ্যাভ আ প্ল্যান। কথাটা বেশ জোরেশোরেই বলেছিলেন। আত্মবিশ্বাসের সাথে। দেশের মানুষ তখন ভেবেছিল, না জানি কি একটা আছে! এখন চার মাস পরে এসে বোঝা যাচ্ছে প্ল্যানটা আসলে কী ছিল। ক্ষমতায় যাই আগে, বাকিটা দেখা যাবে!
১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচন নিয়ে নতুন করে বিস্তর কিছু বলার নেই। দেশের মানুষ জানে কী হয়েছিল। বড় দলগুলো ছিল না, ভোটার ছিল না, প্রতিদ্বন্দ্বিতা ছিল না। ছিল শুধু ক্ষমতা দখলের পাতানো আয়োজন। সেই আয়োজনের ফলাফলে যারা মন্ত্রী হয়েছেন, গাড়িতে পতাকা লাগিয়েছেন, তারা আজ দেশের আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতির দায়িত্বে আছেন। এই দায়িত্বে থেকে তারা কী করছেন?
ঢাকার নিউমার্কেটে ২৮ এপ্রিল প্রকাশ্যে গুলি করে মানুষ মারা হলো। রাস্তায়, দিনের বেলায়, মানুষের সামনে। পনেরো দিন পরেও পুলিশ খুনি ধরতে পারেনি। পারেনি মানে পারেনি, নয়তো চায়নি, সেটা পুলিশই ভালো বলতে পারবে। কিন্তু ফলাফল একই। খুনি বাইরে, পরিবার বিচারের আশায় দ্বারে দ্বারে ঘুরছে।
গাজীপুরের কাপাসিয়ায় একই পরিবারের পাঁচজন মারা গেল। পাঁচজন। একটা পরিবার শেষ হয়ে গেল এক রাতে। রাজবাড়ীতে মা-মেয়েকে মেরে মাটিতে পুঁতে রাখা হয়েছিল। বরিশালে মাছ ব্যবসায়ীকে কুপিয়ে মারল। এগুলো এক সপ্তাহের খবর, মাত্র একটা সপ্তাহের।
এই পরিস্থিতিতে আইজিপি কী বললেন? বললেন পুলিশ নিজেই হামলার শিকার হচ্ছে। কথাটা মিথ্যা না হলেও এটা উত্তর না। রাষ্ট্র যখন নাগরিকের নিরাপত্তা দিতে পারে না, তখন সেটা ব্যর্থতা। সেই ব্যর্থতার দায় এড়ানোর জন্য পাল্টা অভিযোগ যথেষ্ট না।
ক্রিমিনোলজির অধ্যাপক সরাসরি বললেন, নির্বাচন-পরবর্তী যেসব পদক্ষেপ নেওয়া দরকার ছিল রাষ্ট্রীয় পর্যায় থেকে, সেগুলো নেওয়া হয়নি। এই একটা বাক্যে পুরো সরকারের অকর্মণ্যতার ছবি আছে। ক্ষমতায় বসার পর অগ্রাধিকার ঠিক করতে হয়। এই সরকার অগ্রাধিকার কী ঠিক করেছিল, সেটা ফলাফল দেখেই বোঝা যাচ্ছে।
বিএনপির জন্মই হয়েছিল গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার বাইরে থেকে। ক্ষমতার সাথে তাদের সম্পর্ক সবসময় জনগণের ম্যান্ডেটের চেয়ে অন্য হিসাবে বেশি চলেছে। এবারও সেই চিরাচরিত ছক। প্রধান প্রতিপক্ষকে বাইরে রাখো, একটা ভোটের আয়োজন করো, তারপর বৈধতার দাবি করো। কিন্তু বৈধতা শুধু কাগজে থাকলে হয় না। মানুষের জীবনে প্রমাণ করতে হয়।
সেই প্রমাণ এখন পর্যন্ত নেই। উল্টো প্রতিদিন পরিসংখ্যান একটু একটু করে ভারী হচ্ছে। ভুক্তভোগী পরিবারগুলো বিচার পাচ্ছে না বলে যে তথ্য বেরিয়েছে, সেটা শুধু পুলিশি ব্যর্থতার গল্প না। এটা একটা রাষ্ট্রের গল্প, যে রাষ্ট্র তার মানুষের কাছে জবাবদিহি করে না, কারণ সে জানে ভোটের বাক্স তাকে ভয় দেখাতে পারবে না।
তারেক রহমানের প্ল্যান নিয়ে জনগণ এখনো অপেক্ষায়, হোক না সেটা প্রতিদিন তিনটা করে লাশ হয়েই!

